Tuesday, 9 August 2016

শেষ মুহূর্তের গোলে জার্মানির কাছে হারলেও ভারতের খেলায় আমি গর্বিত - ধনরাজ পিল্লাই





 ঘড়িতে দেখছিলাম, আর পাঁচ সেকেন্ড বাকি। আর ঠিক তখনই প্রায় ২০ গজ দূর থেকে আসা ফ্লিকটা গোলমুখে স্টিকে ডিফ্লেক্ট করে দিল জার্মান প্লেয়ার রার। তৎক্ষণাৎ আমার মতোই কোটি কোটি ভারতীয় হকিপ্রেমীর হৃদয় বিদীর্ণ হল। লন্ডন ওলিম্পিকসে জার্মানি হকিতে সোনা জিতেছিল। সেই দলের বিরুদ্ধে ভারতীয় হকি খেলোয়াড়রা সোমবার যেরকম উচ্চমানের পারফরম্যান্স মেলে ধরল, তাতে আমি গর্বিত। একজন প্রাক্তন হকি ওলিম্পিয়ান হিসেবে আমার বুকের ছাতি মনে হচ্ছে কয়েক ইঞ্চি বেড়ে গেল। জার্মানির মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ভারত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি হকিতে কয়েকমাস আগে গ্রুপ পর্বে ড্র করেছিল। তারপর ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে তূল্যমূল্য লড়াই করে ম্যাচ টাই-ব্রেকারে হেরে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে রানার্স হয়েছিল। তখনই শ্রীজেশরা বুঝিয়ে দিয়েছিল তাঁরা এখন আর অস্ট্রেলিয়া, জার্মানির মতো শক্তিশালী দলগুলোকে ভয় পায় না। সোমবার প্রথম কোয়ার্টারে ভারতীয় দল রীতিমতো দাপটে জার্মান দূর্গে হানা দিয়েছে। ১০ মিনিটে আকাশদীপের থ্রু ধরে ডি বক্সে ঢুকে নিকিন থিমাইয়ার রিভার্স ফ্লিক শেষ মুহূর্তে বাঁচিয়ে দেন জার্মান গোলরক্ষক। নিকিন থিমাইয়া বলটা সেকেন্ড পোস্টে রাখলে গোল পেয়ে যেত। ১৮ মিনিটে জার্মানি প্রথম গোল করে এগিয়ে গেল। আমি এক্ষেত্রে শ্রীজেশকে আংশিক দায়ী করব। বিগ বডির জার্মান প্লেয়ার ওয়েলেন ডি বক্সে ঢুকে জায়গা বানিয়ে ফ্লিক করে। বলটা শ্রীজেশের স্টিকে লেগে গোলে ঢুকে যায়। যাই হোক, ভারত কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতে বেশি সময় নেয়নি। ২২ মিনিটে দুরন্ত ড্র্যাগ ফ্লিকে পেনাল্টি কর্নার থেকে রুপিন্দর পাল সিং গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরায়। রুপিন্দরের লড়াই ও পেনাল্টি কর্নার সদ্ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। এরপর এস ভি সুনীল বক্সে ঢুকে পড়ে। কিন্তু নিকিন দু’বার চার গজ দূরে স্টিকে বল পেয়েও গোলে ঠেলতে পারল না দেখে আমি কপাল চাপড়াতে বাধ্য হলাম। এরপর আবার ভারতের আক্রমণ। মাঝমাঠ থেকে বল টেনে আকাশদীপ দারুণ ড্রিবল করে তিন জার্মানকে টপকে ডি বক্সে ঢুকে পড়ে। কিন্তু তাঁর হিট বাইরে বেরিয়ে যায়। তৃতীয় ও চতুর্থ কোয়ার্টারে ভারত তুল্যমূল্য লড়াই করেছে। কিন্তু সব আশা শেষ হয়ে যায় ম্যাচের সমাপ্তির তিন সেকেন্ড আগে। গোলের খুব কাছ থেকে জার্মান প্লেয়ার রার বলটা স্টিকে ঘুরিয়ে দেয় গোলের দিকে। এক্ষেত্রে কিছুই করার ছিল না শ্রীজেশের। আমি ওকে এই গোলের জন্য দোষ দেব না। আর ভারত শেষ মুহূর্তে গোল খেয়েও ম্যাচ হেরে এখনও ভালো জায়গায় রয়েছে। কারণ, আমি ধরে রেখেছিলাম, জার্মানি ও হল্যান্ডের কাছে আমাদের হারতে হবে। সেই জায়গায় জার্মানির বিরুদ্ধে শেষমুহূর্তে গোল হজম করেও মোরাল ভিকট্রি হয়েছে ভারতের। আমরা বুঝিয়ে দিয়েছি, বিশ্বের কোনও দলকে ভারত আর এখন ভয় পায় না।
এর আগে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে ভারত ৩-২ গোলে জেতার পর আমি শ্রীজেশদের অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। দীর্ঘ ১২ বছর বাদে সেটা ছিল ওলিম্পিক হকিতে ভারতের প্রথম জয়। আর সেই জয়ে শেষবার আমারও ভূমিকা ছিল। ২০০৪ সালে এথেন্স ওলিম্পিকসে ওই ম্যাচটা খেলেই আমি আন্তর্জাতিক হকি থেকে অবসর নিয়েছিলাম। ওই ম্যাচে কোরিয়াকে আমরা হারিয়েছিলাম। তবে তখন এই দলের মতো তিনজন তৈরি ড্র্যাগ ফ্লিকার আমাদের ছিল না। এবার রঘুনাথ না পারলে রয়েছে রুপিন্দর পাল (বব)। ও আটকে গেলে পেনাল্টি কর্নার নেবে হারমানপ্রীত সিং। সুতরাং বুঝতেই পারছেন রোল্যান্ট ওল্টম্যান্সের কোচিংয়ে এই ভারতীয় দলটির গভীরতা যথেষ্ট রয়েছে। আমার ধারণা, কানাডাকে ভারত হারিয়ে দেবে। আর আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধেও আমাদের জেতা উচিত। তাহলেই ভারত কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার টিকিট পেয়ে যাবে। আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে চতুর্থ কোয়ার্টারে ভারতীয় ডিফেন্সকে বেশ নড়বড়ে মনে হয়েছিল। সেই তুলনায় জার্মানির বিরুদ্ধে অনেক সংঘবদ্ধ ছিল ভারতীয় রক্ষণ। বেশি পেনাল্টি কর্নার উপহার দেয়নি জার্মানিকে। এখনও অবধি এটাই ভারতীয় দলের সেরা পারফরম্যান্স। তবে সর্দার সিংকে আরও বেশি দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হবে। আকাশদীপ ও মনপ্রীত ভালো খেলছে। তাই আমি খুবই আশাবাদী এই ভারতীয় দলটিকে নিয়ে।

No comments:

Post a Comment